
পরেশ দেবনাথ,কেশবপুর,যশোর।
কেশবপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে জাকজমকপূর্ণভাবে চড়ক পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলকোট, বিদ্যানন্দকাটি, পাঁচপোতা, পাঁচপোতা দাসপাড়া, বসুন্তিয়া দাসপাড়া, পাথরা, বড়েঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, আলতাপোল বারুই পাড়া, আলতাপোল দাস পাড়া, পরচক্রা, কালিয়ারইসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে চার দিন ধরে চড়ক পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (ইং-১২ এপ্রিল২৬) থেকে শুরু হয়ে বুধবার পর্যন্ত চলবে চড়ক পূজার অনুষ্ঠান। এটি চৈত্র মাসে পালিত হিন্দু দেবতা শিবের গাজন উৎসবের একটি অঙ্গ। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে যা চড়ক সংক্রান্তির মেলা নামে অভিহিত। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিতে বা চৈত্রের শেষ দিনে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
বেল কাস্ট নির্মিত মহাদেবকে চৈত্রমাসে স্নান করিয়ে সিঁদুর ও সরিষার তেল মাখানো হয়। তারপর লালচি দিয়ে ভালভাবে জড়ানো হয়। পরানো হয় আকন্দ, জবা, বেলী, গন্ধাঁ ফুলের মালা-সহ বেল পাতার তৈরি মালা। লাগানো হয় স্বর্ণের চোখ। তারপর বাড়ী বাড়ী ঘুরে সংগ্রহ করা হয় চাল, তরকারী, ফল, বাতসা আর টাকা। পূজার সন্ন্যাসীরা চড়ক পূজার কয়েকদিন আগে থেকে কঠোর ব্রত ও সংযম পালন করেন।
সরেজমিন আলতাপোল যাক জমক পূর্ণ ভাবে চড়ক পূজা অনুষ্ঠানে যেয়ে দেখা যায়, পূজার দ্বিতীয় দিনে খেজুর গাছ গোড়ায় য়েয়ে সেখানে ভোগ, ধূপ, ধুনা দেওয়ার পর মন্ত্র পাঠের সাথে সাথে সন্যাসীরা গাছ তলায় মাথা খোঁড়েন। সাথে থাকে ঢাক-ঢোল-কাঁসি-সহ বাজাদার৷ এর পর প্রধান সন্যাসী খেজুর গাছটিকে শিবের বেড়ী দিয়ে বেড়ী বদ্ধ করে রাখেন। সন্ন্যাসীরা ওই বেড়ীর ফাঁকের ভিতর দিয়ে গাছের মাথায় উঠে খেজুর ভেঙ্গে ভক্তদের উদ্দেশ্যে নিচে ফেলে দেন। খেজুরের থলি ভেঙ্গে এনে মূল সন্ন্যাসীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। সকল সন্ন্যাসী অক্ষত অবস্থা ফিরে আসেন।
আলতাপোল চড়ক পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক পলাশ বিশ্বাশ জানান, পূজার দ্বিতীয় দিনে মূল সন্যাসীর শম্ভু সেন, বালাদার সঞ্জয় দেবনাথ, পূরোহিত প্রনব চট্টোপাধ্যায় বাপী ও লায়েক লক্ষী ভদ্র-এর নেতৃত্বে আলতাপোল সুধীর দেবনাথের দানকৃত খেজুর গাছটিতে পূজা করে খেজুর ভাঙ্গা হয়। এবার ৪৮ জন সন্যাসী এই চড়কপূজায় অংশগ্রহন করেন।খেজুর ভাঙ্গা শেষে প্রসাদ বিতরন করে আলতাপোল সার্বজনীন দোলখোলা মন্দিরে যেয়ে আনুষঙ্গি কাজ সেরে রাতে হাজরা ভাটার অনুষ্ঠান করা হয়।
বালাদার সঞ্জয় দেবনাথ জানান, গ্রামের মঙ্গলার্থে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে এই পূজাটি করে আসছি। শত শত মানুষ এখানে পূজা দেখতে আসেন। দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি, মনের বাসনা পূরণসহ মহাদেবতা শিবের সন্তুষ্টি লাভই এ পূজার উদ্দেশ্য।
লায়েক লক্ষী ভদ্র জানান, চড়ক পূজা হলো চৈত্র সংক্রান্তিতে (চৈত্রের শেষ দিনে) পালিত বাংলার অন্যতম প্রধান গ্রামীণ লোকোৎসব। এটি মূলত শিবের গাজনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে শিবের উপাসকেরা বা সন্ন্যাসীরা কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে নিজের শরীরের যন্ত্রণাকে ধর্মের অঙ্গ হিসেবে মেনে নিয়ে শিবের আরাধনা করেন এবং পুরনো বছরের জীর্ণতা দূর করার কামনা করেন।
উল্লেখ্য, গতবছরের এই বিকেলে মঙ্গলকোট বাজার সংলগ্ন আলতাপোল গ্রামের বারই পাড়া চিত্ত পালের ছেলে সাধন পাল (৩০) খেজুর ভাঙ্গতে যেয়ে গাছের মাথা থেকে পড়ে বাম হাত ভেঙ্গে যায়। এখনও পর্যন্ত তিনি দারুণ অসুস্থ অবস্থায় দিন যাপন করছেন।
ছবিঃ
১৩/০৪/২৬