
অরবিন্দ কুমার মণ্ডল, কয়রা, খুলনাঃ
গতকাল যে বাড়িটি ছিল বিয়ের আনন্দে আত্মহারা আজ সেই বাড়ির চারি পাশে শুধু কান্নার আওয়াজ। লাল শাড়ি আর মেহেদী রঙ্গা হাতে যাচ্ছিলেন শশুর বাড়ি। কনেকে বরণ করতেও প্রস্তুত ছিল শশুর বাড়ির লোকজন তার ঠিক কয়েক ঘন্টা আগে সড়ক দূর্ঘটনায় নিভে গেছে ১৪ টি প্রাণ।
বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দূর্ঘটনায় খুলনার কয়রা উপজেলার নববধূ মিতু সহ একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের ছালাম মোড়লের মেয়ে নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু (১৮), তার ছোট বোন লামিয়া (১১) এবং মিতুর দাদি রাশিদা বেগম (৭৫)। এ ঘটনায় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪ টায় নববধু সহ তিন জনের লাশ পৌছায় তাদের বাড়িতে।
লাশ বাড়িতে পৌছানোর পর থেকে পাগল প্রায় মিতুর বাবা, মা ও স্বজনরা। কান্না, আর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
আজ শুক্রবার সকাল ১০ টায় উত্তর নাকশা গ্রামেই তাদের জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শ্রেনী পেশার লোকজন সেখানে উপস্থিত হন। জানা শেষে পারিবারিক কবর স্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন হাফেজ আবু বকর ছিদ্দিক।
এর আগে ১৩ মার্চ বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে খুলনা–মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বোলাই ব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, গত বুধবার রাতে উপজেলার নাকসা গ্রামের সালাম মোড়লের মেয়ে মিতুর বিয়ে হয় রামপাল এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সাব্বির হোসেনের সঙ্গে। বৃহস্পতিবার সকালে নববধূ মিতু তার ছোট বোন লামিয়া ও বৃদ্ধা দাদি রাশিদা বেগমকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি রামপাল বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে মংলা থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসে থাকা নববধূ, বর ও তাদের স্বজনসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঐ দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতদের গ্রাম নাকসাসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়িতে স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার সকালে নিহত নববধুর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার পিতা আঃ ছালাম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল। তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে আর বলছে আমার মায়েরা কোথায়। আমি একটু তাদের দেখবো। তার কান্নায় উপস্থিত সকলের চোখে পানি এসে যায়। তার দুই মেয়ে আর নিজের মায়ের মুত্যুকে যেন মেনে নিতে পারছেনা তিনি। সালামের পিতা আগেই মারা যান। বেঁচে ছিল তার মা। দুই কন্যা আর এক মাত্র শিশু পুত্র ইসমাইলকে নিয়ে ছিল তার সব স্বপ্ন। ঐ বিয়ের গাড়িতে পুত্র ইসমাইল জোর করে উঠলেও জায়গা না থাকায় তাকে নামিয়ে নেওয়া হয়ছিল। তার আপদার মিটাতে সকালেই নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তাকে আর বরের বাড়ি যেতে হলোনা।
মিতুর মা মুন্নি খাতুনের অবস্থা খুবই খারাপ। মেয়ে দুটি আর শাশুড়ির লাশ বাড়িতে আনার সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তিনি। মাঝে মাঝে চোখ দুটি একটু মেলানোর চেষ্টা করছে। তবে কিছু বলতে পারছেনা। এলাকার মানুষ তাকে সান্তনা দিয়েই চলেছে তাদের কিছু হয়নি। তাতে কি আর মানায় আগেই সে জানতে পরছিল। ঐ সড়ক দুর্ঘটনায় মুন্নির মাতা ও নববধুর নানীও নিহত হয়েছে। তাকে দাকোপ উপজেলার পানখালী গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
নিহত নববধূর চাচা মোফেজ মোড়ল বলেন, তার পরিবারকেে সান্তনা দেওয়ার মতো ভাষা নেই। এত বড় শোক কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়।
নাকশা ডিএফ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম বলেন, নিহত নববধু মিতুু তার মাদ্রাসার আলিম শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তার সরলতা পুরো শিক্ষকদের মন জয় করে নিতে পারছিল। তাকে হারিয়ে শিক্ষকরাও শোকে মাতোয়ারা।
আমাদী ইউনিয়ন পরিষদর চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জুয়েল বলেন, ইতিপুর্বে এমন ঘটনা তার ইউনিয়নে আর কখনও ঘটেনি। পুরো ইউনিয়নের মানুষ শোকে স্তব্দ। নিহতদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ তদন্ত মোঃ শাহ আলম বলেন, ময়না তদন্ত শেষে নাকশা গ্রামে পারিবারিক কবর স্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
কয়রা, খুলনা প্রতিনিধি
তারিখঃ ১৩/০৩/২৬ ইং।