অরবিন্দ কুমার মণ্ডল, কয়রা, খুলনঃ
১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত মধু আহরণ মৌসুম। টানা দুইমাস ৩১ মে পর্যন্ত চলবে এ কার্যক্রম। সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে খলিশা, বাইন, গেওয়া, পশুরসহ নানা প্রজাতির ফুলে গড়েওঠা ছোট-বড় মৌচাক থেকে মৌয়ালরা মধু ও মোম সংগ্রহ করবেন।
সুন্দরবন পশ্চিমবনবিভাগের আওতাধীন খুলনার কয়রা ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার অধিকাংশ মানুষ জীবিকার জন্য বন নির্ভর। প্রতিবছর এসব এলাকার বহু মৌয়াল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে প্রবেশ করেন মধু সংগ্রহ করতে। অতীতে বাঘের আক্রমণে মৌয়ালদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও চলতি মৌসুমে তাদের প্রধান উদ্বেগ হয়ে উঠেছে বনদস্যুদের অপতৎপরতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনে বনদস্যুতা বেড়েছে। ফলে জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালদের মধ্যে ভীতি তৈরী হয়েছে এবং অনেকেই বনে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এতে তাদের জীবন জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় মৌয়ালরা বলছেন, বাঘের তুলনায় বনদস্যুদের নির্যাতন বেশি ভয়ংকর। দস্যুরা তাদের আটক করে মধু ও মাছ ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া মুক্তিপণের মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ আদায় ও শারীরিকভাবে নির্যাতনও করে। এ পরিস্থিতিতে চলতি মৌসুমে মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সুন্দরবন পশ্চিমের খুলনা রেঞ্জে ৭০০ কুইন্টল মধু ও ২১০ কুইন্টাল মোম ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬শ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে সুন্দরবন থেকে মধু আহরণ করা হয়েছিল ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে ৩ হাজার ৮ কুইন্টাল হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরও কমে হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল। তবে অবৈধভাবে সংগৃহীত মধু এ হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
মৌসুমের শুরুতে খলিশা ফুলের মধু পাওয়া যায়, যা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও দামী। এরপর পর্যায়ক্রমে গরান, কেওড়া ও ছইলাফুলের মধু সংগ্রহ করা হয়। তবে পর্যাপ্ত বৃষ্টিনা হওয়ায় এ বছর কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মধু পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
কয়রার মৌয়াল মুজিবুর রহমান জানান, “এলাকায় কাজ না থাকায় ধারদেনা করে বনে যাচ্ছি। মধু না পেলে ঋণের বোঝা বাড়বে। আবার দস্যুদের হাতে পড়লে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে।
আরেক মৌয়াল রইচ উদ্দিন জানান, এবছর ডাকাতের যা উৎপাত শুনতেছি তাতে চালান বাঁচবে কি না বুঝতেপারছি না। বাজার সদয় করা না হয়ে গেলে এবছরবনে মধু কাটতে যেতাম না।
কয়রা কেয়ারফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক মোহসিন আলম বলেন, উপকূলের মানুষেরা জীবিকার তাগিদে জীবনের মায়া ত্যাগ করে বাঘ ,কুমির আর সাপের মুখ থেকে মধু আহরণ করে। তবে ৫ আগষ্টের পর থেকে সুন্দরবনে দস্যুতা বেড়ে গেছে। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে জেলে ,বাওয়ালী ও মৌয়ালের পেশা হুমকির মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের বিভাগীয়বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেড এমহাসানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে নির্বিঘ্নে মধু আহরণের জন্য বনবিভাগের টহলকার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এছাড়াএবারবন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষারজন্য মৌয়ালদের সাবধানে চলাফেরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কয়রা, খুলনা প্রতিনিধি
তারিখঃ ০১/০৪/২৬ ইং।