অরবিন্দ কুমার মণ্ডল, কয়রা, খুলনাঃ
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীব- বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং মাছ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজণন নিশ্চিত করতে সব ধরনের বনজীবী ও পর্যটকদের ১ জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বন বিভাগ।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত সুন্দরবনের অধিকাংশ মাছ, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের মূল প্রজণন মৌসুম। বিশেষ করে বর্ষার এই সময়ে সুন্দরবনের ২৫১ প্রজাতির মাছ নদী ও খালে ডিম ছাড়ে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীদের প্রজনন ঘটে এবং বিভিন্ন গাছের বীজ থেকে নতুন চারা গজায়। পর্যটক ও বনজীবীদের নৌযান চলাচলের কারণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজণন ব্যাহত হয়। তাই বনকে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ দিতে এই তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশের সব ধরনের পাস-পারমিট বন্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ বনে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বন্য প্রাণী শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ আহরণ বন্ধে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে নজরদারি পরিচালনা করবে।
এদিকে, টানা তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চরম অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা নিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে হাজারো বনজীবীর।
আজ সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীরে গিয়ে দেখা যায়, সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ফিরে আসা শতাধিক মাছ-কাঁকড়া ধরার নৌকা নদীতীরে বেঁধে রাখা হয়েছে। অনেকেই নৌকা মেরামত করার জন্য বেড়িবাঁধের ওপর উঠিয়ে রেখেছেন।
কয়রার বনজীবী খলিলুর রহমান ও ভবতোষ মন্ডল জানান, সুন্দরবনের মাছ-কাঁকড়া এবং মধু আহরণ করেই তাদের সংসার চলে। এলাকায় বিকল্প কোনো কাজ নেই। বছরের এই বড় সময় বন বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে তাদের কষ্টের সীমা থাকবে না। সাগরে মাছ ধরা জেলেদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হলেও সুন্দরবনের জেলেদের কোনো সহায়তা দেওয়া হয় না বলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নামমাত্র জেলে কার্ড করা হলেও অধিকাংশ প্রকৃত জেলে বাদ দিয়ে যারা প্রকৃত জেলেনা তাদেরকে জেলে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এই বন্ধের সময়ে তারা সরকারের কাছে খাদ্য সহায়তা ও বিশেষ প্রণোদনার জোর দাবী জানান।
বুড়িগোয়ালিনী এলাকার কাঁকড়া শিকারী জামাল হোসেন এবং জেলে আনিসুর রহমান জানান, আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় এই তিন মাস সংসার চালাতে তাদের চড়া সুদে মহাজন ও এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিতে হবে, যা তাদের পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জালে আবদ্ধ করবে। অন্যদিকে, সুন্দরবনে পর্যটন বন্ধ থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন ট্রলার মালিক ও শ্রমিকরা। নীলডুমুর এলাকার ট্রলার মাঝি রিপন গাজী জানান, তিন মাস নৌকা অলস বসে থাকলে নোনা পোকা লেগে বোর্ড নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তারা দ্বিগুণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলাটিতে নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১৩ হাজার ৫২৬ জন। তবে স্থানীয় বনজীবীদের দাবী, ভৌগোলিক কারণে কয়রার ৫টি ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল এবং এখানে প্রকৃত বনজীবী পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার জানান, অনেক প্রকৃত জেলের কার্ড নেই, আবার অনেকে প্রকৃত জেলে না হয়েও কার্ড পেয়েছেন। প্রকৃত জেলেদের যাচাই-বাছাই করে উপকারভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের ডেপুটি রেঞ্জার মোঃ নাসির উদ্দিন জানান, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিষিদ্ধ কালীন সময়ে বনে অনুপ্রবেশ বন্ধে সকল প্রকার ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তাছাড়া বনজীবীসহ সকলের সচেতনার্থে প্রধান বন কর্মকর্তার নির্দেশে উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাসানুর রহমান জানান, সুন্দরবনের সুরক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে। তবে বনজীবীদের মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের জন্য মাসে ৪০ কেজি করে চাল দেওয়ার একটি প্রস্তাবনা ও তালিকা মৎস্য দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
আগামী ৩১ আগস্ট নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর, ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন পুনরায় সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
কয়রা, খুলনা প্রতিনিধি
তারিখঃ ০১/০৬/২৬ ইং।