খুলনা প্রতিনিধি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) আইন ডিসিপ্লিনের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী মৌমিতা হালদারের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রতিবাদ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদি চত্বরে এ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। পাশাপাশি শিক্ষকগণও এতে অংশগ্রহণ করেন।
সমাবেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী দাবি তুলে ধরে বলেন, “আমরা গতকাল রাতে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারের দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু ১২ ঘণ্টা পার হওয়ার পরেও এখনো পর্যন্ত দোষীদের খুঁজে বের করা হয়নি। আমাদের দ্বিতীয় দাবি ছিল লাইসেন্সবিহীন সকল ধরনের যানবাহন বন্ধ করা।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তৌকির জোয়ার্দার বলেন, “যারা দায়িত্ব পালন করেন, তারা যদি দায়িত্ব পালন না করেন, তবে দায়িত্ব ছেড়ে দিন। সঠিক বিচার করতে না পারলে খুবি শিক্ষার্থীরা আপনাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। নগরীতে যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত চালক না থাকলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমবে না। আমরা চাই এই অন্যায় ও অনিয়ম বন্ধ হোক।”
চতুর্থ বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী রেজওয়ানুল হক রাদ বলেন, “আমরা এমন একটি রাষ্ট্রে বসবাস করি, যেখানে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আমরা অনিশ্চিত থাকি যে বাসায় ফিরতে পারবো কিনা। এত মানুষ সংসদে গেল, কিন্তু সাধারণ মানুষের কথা কেউ বলে না। ঈদের যাত্রায় এত মানুষের প্রাণ ঝরে গেল, অথচ সড়ক প্রতিমন্ত্রী বলেছেন এবারের ঈদ যাত্রা সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল হয়েছে।”
মৌমিতার সহপাঠী মেহরাফ হোসেন বলেন, “কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে আমরা জানি না। একটি প্রাইভেটকার ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কিনা, সেটাও আমরা জানি না। রাস্তাঘাট ও ফুটপাতের বর্তমান অবস্থা এবং যানজট সব মিলিয়ে নিরাপত্তা অনিশ্চিত। আমরা চাই এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দোষীদের বিচার নিশ্চিত করা হোক।”
আইন ডিসিপ্লিনের শিক্ষক তানিয়া সুলতানা বলেন, “আমার ছাত্রী প্রাণ হারিয়েছে কথাটি ভুল; আমার ছাত্রীর প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখে থেমে গেলে চলবে না। আমরা বারবার বলি ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে, এসবের অনুমোদন কে দিয়েছে? প্রশাসন কী করছে? তারা কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে? কোন প্রাইভেটকার ধাক্কা দিয়েছে, কী ঘটেছিল তা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বের করতে হবে। আমরা আর কোনো মৌমিতাকে হারাতে চাই না এটি রাষ্ট্রের সর্বসাধারণের দাবি।”
আইন ডিসিপ্লিনের প্রধান পুনম চক্রবর্তী বলেন, “পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী বোঝা হলো পিতামাতার কাঁধে সন্তানের লাশ, আর শিক্ষকের কাঁধে শিক্ষার্থীর লাশ। আমি রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাছে দাবি জানাচ্ছি আর কোনো প্রাণ যেন এভাবে কেড়ে না নেওয়া হয়। আমরা ন্যায়বিচার চাই।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হলো গল্লামারি মোড়। কিন্তু এই ব্রিজ কবে হবে? আমরা চাই সবাই মিলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। আমরা যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই, তবে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। তবেই মৌমিতার সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার পাওয়া সম্ভব হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. নাজমুস সাদাত বলেন, “আমরা অনেক দিন যাবৎ একটি অব্যবস্থাপনার মধ্যে আছি। বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিক সরকার এসেছে। এখনো অনেক সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে। আমরা আশা রাখছি আর আমাদের মৌমিতাদের হারাতে না হয়। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের একমাত্র চাওয়া নিরাপদ সড়ক।
তিনি বলেন, আমাদের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় দোয়া-দুরুদ পড়ে বের হতে হয় এটা দুঃখজনক বাস্তবতা। আমাদের দাবি থাকবে, অননুমোদিত অটো যানবাহন বন্ধ করতে হবে। সড়ক ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রক্রিয়ায় আনতে হবে। এই শৃঙ্খলা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামবো না। আমরা আমাদের ছাত্রীকে হারিয়েছি, আর যেন কোনো মৌমিতাকে হারাতে না হয়। আমার ছাত্রীর মা-বাবাকে আমি সান্ত্বনা দিতে পারিনি। আমি শুধু বলতে চাই সড়কে শৃঙ্খলা না এনে আমরা থামবো না।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, “এই ধরনের দুর্ঘটনার কথা শুনলেই আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। এ আমার সন্তান আমি কষ্ট পাই। এমন একটি তরতাজা প্রাণ চলে গেল। আমি তোমাদের পাশে আছি। যেখানে যা প্রয়োজন, আমি সবসময় তোমাদের সঙ্গে থাকবো। তোমাদের দিকে সবাই তাকিয়ে থাকে। তোমরা যদি সোচ্চার থাকো, তবে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব। আমরা এই মৃত্যুতে গভীরভাবে ব্যথিত। খুবির শিক্ষার্থীরা সবসময় সোচ্চার থাকলে নগরবাসীর জন্যও তা কল্যাণকর হবে। তোমরা সজাগ থেকো, অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাশে থেকো তাহলে আমিও সবকিছু করতে পারবো।”