পরেশ দেবনাথ, বিশেষ প্রতিনিধি।
যশোরের কেশবপুরে মৎস্য ঘের করতে ব্যবসায়ীরা শতাধিক সরকারি রাস্তা ঘেরের ভেড়ী হিসেবে ব্যবহার করে প্রায় পাঁচ হাজার মাছের ঘের করায় হুমকির মুখে পড়েছে গ্রামীণ সড়কগুলো। এছাড়া ওই সমস্ত ঘের মালিকরা একাধিক সরকারি খালের পানি নিষ্কাশন পথ বন্ধ করে মাছের ঘের করায় এ উপজেলায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী আকার ধারণ করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন বিল জলাশয়গুলোতে আউশ, আমান আবাদ হচ্ছে না, অন্যদিকে হাজার হাজার হতদরিদ্র পরিবার বিলে মাছ শিকার করতে ব্যর্থ হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কেশবপুর পৌরসভাসহ ১১টি ইউনিয়নে ছোট বড় মিলে প্রায় ২”হাজার বিল, জলাশয় রয়েছে। এসব বিলগুলোর মধ্যে বিল বলদহালি, টেপুর বিল, বিল গরালিয়া, পদ্মবিল, ঘোচ মারার বিল, কাদার বিল, মহাদেবপুর বিল, পাঁচপোতার বিল, হাজোয়ার বিল, বিল খুকশিয়া, বোয়ালিয়ার বিল, বিষ্ণুপুর বিল উল্লেখযোগ্য। আশির দশকে এসব বিলের মাছ শিকার করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করতো হাজারও জেলে সম্প্রদায়। এছাড়া বিলগুলোর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকায় ধান, পাট, মুশুড়ি, শাক সবজিসহ বিভিন্ন ধরণের ফসল আবাদ হতো। নব্বই এর দশকে এসব বিল, খাল, নদীর অববাহিকা দখল করে সমাজের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এলাকার ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে নাম মাত্র কিছু কৃষকের হারি দিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। এ সময় থেকে ঘের মালিকরা গ্রামীণ প্রধান সড়কগুলো ঘেরের ভেড়ী/বাধ হিসেবে ব্যবহার করে মাছ চাষ শুরু করেন। ফলে বিলের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার জেলে সম্প্রদায় ও হতদরিদ্র মানুষ বিলে মাছ শিকার করতে ব্যর্থ হয়ে বাধ্য হয় অন্যপথ বেছে নিতে। ঘের মালিকরা সরকারি খালের পানি নিষ্কাশন পথ ব্যক্তিগতভাবে পাকা কালভার্ট নির্মাণ করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বন্ধ করে মাছ চাষ করার কারণে কেশবপুর উপজেলা ব্যাপী দেখা দেয় স্থায়ী জলাবদ্ধতা। ফলে নদীর জোয়ার ভাটা বন্ধ হয়ে নদীগুলো মরতে শুরু করে। নদী ভরাট হওয়ার কারণে সব বিল জলাশয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। জলাবদ্ধতার কারণে বিলে ফসল আবাদ বন্ধ হয়ে যায়।
জানা গেছে, ঘের মালিকরা ঘেরের ভেড়ী হিসেবে সরকারি রাস্তা ব্যবহার করায় এ উপজেলার প্রধান সড়কসহ গ্রামীণ শতাধিক পাকা ও ইটের সোলিং সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে যশোর-সাতক্ষীরা মহা সড়কসহ কেশবপুর-পাঁজিয়া সড়ক, কেশবপুর-ভেরচী সড়ক, কেশবপুর-ফতেপুর সড়ক, কলাগাছী-চুকনগর সড়ক, মঙ্গলকোট-হিজলডাঙ্গা সড়ক, মঙ্গলকোট-পাঁচপোতা সড়ক, বাকাবর্শি-গড়ভাঙ্গা সড়ক, মজিদপুর-লক্ষীনাথকাটি সড়ক, কেশবপুর-ত্রিমোহিনী সড়ক, ত্রিমোহিনী-সাগরদাঁড়ি সড়ক, মনোহরনগর-বাকডাঙ্গা সড়ক, ব্যাসডাঙ্গা-ইমাননগর সড়ক, গোলাঘাটা বাজার-মঙ্গলকোট সড়ক, শ্রীফলা-মঙ্গলকোট সড়ক, সাবদিয়া-সরফাবাদ সড়ক ধসে নষ্ট হয়ে গেছে। যার কারণে এসব সড়ক দিয়ে সাধারণ মানুষ, হাটুরেসহ ছোট বড় যানবাহন চলাচলে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, যশোর-সাতক্ষীরা মহা সড়কের ফকির রাস্তা থেকে কেশবপুর বাস-ট্রাক টার্মিনাল পর্যন্ত বাধ হিসেবে ব্যবহার করে মাছের ঘের করেছেন ঘের মালিকরা। কেশবপুর-পাঁজিয়া সড়কসহ কমপক্ষে ১০টি পাকা সড়ক বাধ হিসেবে ব্যবহার করে ঘের করা হয়েছে। এছাড়া ঘের মালিকরা গোলাঘাটা বাজার-মঙ্গলকোট সড়ক, শ্রীফলা-মঙ্গলকোট সড়ক, মঙ্গলকোট-হিজলডাঙ্গা সড়ক, মঙ্গলকোট-পাঁচপোতা সড়ক, ত্রিমোহিনী-সাগরদাঁড়ি সড়কসহ শতাধিক রাস্তা ঘেরের বাধ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী এম এ জাসির জানান, ঘের মালিকরা সড়ক অবৈধভাবে ভেড়ী/বাধ হিসেবে ব্যবহার করে মাছ চাষ করার ফলে সড়কের পার্শ্বের ঢাল ও সোল্ডারসহ পিচের রাস্তা ভেঙে গেছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী সড়ক থেকে পৃথক ভেড়ী/বাধ নির্মাণ করে মাছ চাষের বিধান রয়েছে। ঘের মালিকরা তা অমান্য করে সড়কের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে চলেছে।উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সূদীপ বিশ্বাস বলেন, কেশবপুর উপজেলায় ৪ হাজার ৬৫৮টি মাছের ঘের রয়েছে। এছাড়া পুকুর রয়েছে ৬ হাজার ৬৪০টি। ঘের মালিকদের ভবদহ এলাকায় ঘের স্থাপন নীতিমালা অনুসরণ করে ঘের স্থাপন করতে বলা হয়েছে। এ নিয়ে মাইকিং করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেকসোনা খাতুন বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ না করে মৎস্য ঘের স্থাপন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ছবিঃ
১১/০৬/২৬