পরেশ দেবনাথ, বিশেষ প্রতিনিধি।
কেশবপুরে দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকা পাবলিক লাইব্রেরিটি পুনরায় চালু করার দাবী রাখেন কেশবপুরবাসী। লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার হলো সমাজের দর্পণ, একটি অঞ্চলের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার বাতিঘর। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যশোরের কেশবপুর পৌর শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এবং দৃষ্টিনন্দন 'কেশবপুর পাবলিক লাইব্রেরি'টি দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে অযত্ন ও চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে। যেখানে একসময় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঠক, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং সংস্কৃতিপ্রেমীদের আনাগোনায় মুখরিত থাকতো, সেখানে আজ শুধুই নীরবতা। লাইব্রেরির মূল ফটকে এখন শোভা পাচ্ছে মরিচা পড়া এক বিশাল তালা, আর পুরো ভবনটি ঢেকে গেছে বুনো লতাপাতা ও আগাছার জঙ্গলে। পত্রিকার পাতায় কিংবা সরেজমিন যখন এই দৃশ্য চোখে পড়ে, তখন একে কোনো লাইব্রেরি নয় বরং একটি পরিত্যক্ত 'ভূতের বাড়ি' বলেই অনুমান করা হয়। ইতিহাসের পাতা ও স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৮৩ সালে এই অঞ্চলের জ্ঞানচর্চাকে বেগবান করতে এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষক সোলাইমান হোসেন, সাহিত্যিক বিমল দে, জহুরুল হক, এরশাদ আলী, মনি মোহর ধর ও আব্দুল করিম-এর যৌথ উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরে ব্র্যাকের কমিউনিটি সেফটি প্রকল্পের সহযোগিতায় এবং যশোর জেলা পরিষদের অর্থায়নে লাইব্রেরিটির দৃষ্টিনন্দন একতলা ভবনটি নির্মিত হয়, যা উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি ছিল স্থানীয় শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য জ্ঞানার্জনের প্রধান মিলনমেলা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সঠিক নেতৃত্বের অভাব এবং রাজনৈতিক দলীয়করণের কালো থাবায় এই প্রতিষ্ঠানটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বর্তমানে লাইব্রেরিটির জানালা ও দরজার কাঠের অংশগুলো পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। যেখানে ধুলোহীন বইয়ের পাতা ওল্টানোর শব্দ থাকার কথা ছিল, সেখানে আজ অন্ধকারের রাজত্ব।
বিভিন্ন মিডিয়ায় বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের তৎপরতায় ভবনের দেয়াল, দরজা আর জানালায় বাসা বাঁধা বছরের পর বছর জমে থাকা আগাছা ও লতাপাতা কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে। একই সাথে ধুলোবালির আস্তরণ পড়া ভেতরের আসবাবপত্র এবং চারপাশ পুরোপুরি পরিচ্ছন্ন করা হয়।
একটি আধুনিক ও জ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠন এবং যুবসমাজকে মাদক ও মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখতে একটি কার্যকর লাইব্রেরির বিকল্প নেই। তবে আশার কথা এই যে, বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেকসোনা খাতুন বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এবং দ্রুত একটি সর্বজনগ্রাহ্য কমিটি গঠন, সংস্কার কাজ ও নতুন বই সংগ্রহের মাধ্যমে লাইব্রেরিটি পুনরায় চালুর আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা কেশবপুরের সর্বস্তরের নাগরিক, ছাত্রসমাজ এবং সচেতন সুধীজন প্রশাসনের এই আশ্বাসকে দ্রুত বাস্তবে রূপ নিতে দেখতে চাই। অবিলম্বে ভবনটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, পাঠাগার কক্ষের আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত পত্রিকা ও সাময়িকী রাখা নিশ্চিত করে এই লাইব্রেরিটিকে তার আগের প্রাণচাঞ্চলতায় ফিরিয়ে দেওয়া দাবী কেশবপুরবাসীর।
ছবিঃ
০৪/০৬/২৬