১৭ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ।৩রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ।সোমবার

পাহাড়ে জুম চাষ,মিশ্রফল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

মোঃমহিউদ্দিন বাঘাইছড়ি,প্রতিনিধিঃ-

 

পাহাড়ে শোভা পাচ্ছে জুমের পাকা ধান। সূর্যের মিষ্টি রোদ যখন সেই ধানের ওপর পড়ে তখন মনে হয় সোনা ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ে। যখন মৃদুমন্দ বাতাসে বয়ে যায় তখন মনে হয় সোনালি ঢেউ খেলা করছে। মনোরম সেই দৃশ্য পাকা ধানের গন্ধ ম ম করছে পাহাড়ি জনপদগুলোতে। বাঘাইছড়ি উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে উঁচু পাহাড় ও টিলা মিলিয়ে শতশত একর পাহাড়ে জুম চাষ হয়েছে। পাহাড়ের যেদিকে চোখ যায় চোখে পড়ে জুম ফসল ও ছোট ছোট মাচাংঘর স্থানীয়দের ভাষায় জুমঘর বলে। এবছর পর্যাপ্ত পরিমানে বৃষ্টিপাতের কারণে জুমের আশানুরূপ ভালো ফলন হয়েছে দাবি জুমিয়াদের।

 

প্রকৃত অর্থে জুম চাষ বলতে পাহাড়ের জঙ্গল কেটে শুকিয়ে অতঃপর পুড়িয়ে পরিষ্কার করে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ করাকে বুঝায়। একটি পাহাড়ে চাষাবাদ করার পর সেটার উর্বরতা বৃদ্ধি করার জন্য ১-২ বছরের জন্য রেখে দিয়ে, আবার অন্য পাহাড়ে গিয়ে একই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করাই হলো জুম চাষ।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠী প্রতি বছর বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ে আগুন লাগিয়ে ঝাড়-জঙ্গল পুড়িয়ে আদি পদ্ধতিতে জুম চাষ করে। ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, মরিচ,তিল,সিম,আমিলা গোটা,বেগুন,কচু, যব, সরিষা, মিষ্টি কুমড়া, মারফা, টকপাতা, ফুল,আদা, হলুদ,কলাসহ বিভিন্ন রকমের মিশ্র চাষাবাদ হয়েছে ।

 

পাহাড়ে বসবাসরত ম্রো, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, লুসাই, চাকমা, পাংখো, বম, চাকসহ ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশরাই জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। শহরে বসবাসরত কিছু সংখ্যক শিক্ষিত পরিবার ছাড়া দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে বসবাসরত পাহাড়িরা আজও জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র ম্রো সম্প্রদায় আদিকাল থেকে এখনো পর্যন্ত জুম চাষের মাধ্যমেই সারাবছরের জীবিকা সংগ্রহ করে।

 

উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, কয়েকবছর ধরে পাহাড়ে প্রতিবছরই জুমের চাষ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ বছর জুমের ফসলের ভালো ফলন হয়েছে। জুমের ধানসহ অন্যান্য ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে জুমিয়া পরিবারগুলো। পাহাড়ের জুম চাষ থেকে জুমিয়ারা সারাবছরের খাদ্য সংরক্ষণ করে। তবে জুম চাষে ক্ষতির পরিমাণও কম নয়, এতে করে পুড়ে ছাঁই হয়ে যায় পাহাড়ের পর পাহাড়। ফলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস ও উপকারি কিট-পতঙ্গ কমে যাচ্ছে। পাহাড় ধ্বস ও নদী সমূহের গভীরতা কমে আসছে। এছাড়াও বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

 

উপজেলার চার কিলোর বাসিন্দা জীবন চাকমা বলেন, পাহাড়ে এবার জুমের প্রচুর ফলন হয়েছে চার কিলো ছাড়াও আশপাশের প্রায় আট থেকে দশ গ্রামের কথাও সে তুলে ধরে বলেন, হাজাছড়া, পানছড়ি, বাদল ছড়ি, কালা মুড়া, পাকুইজ্জাছড়ি, জুম্মবি আদাম, ডাঙ্গা ছড়া, খেদারাক ছড়ায় এবার জুমের ব্যাপক ফলন হয়েছে। এরই মধ্যে বাজারে জুমের ফসল মারফা, চিনাল, বেগুন, পেপে, আদা, কচু,কলা, হলুদ, বিভিন্ন ধরনের লাউ, কুমড়ার বাজার জাত শুরু হয়েছে।

 

হাজাছড়া গ্রামের জুম চাষী পূর্ণজয় চাকমা বলেন, এবার পাহাড়ে জুমচাষ খুব ভালো হয়েছে। প্রতি হাটবারে বাজারে লক্ষাধিক টাকার জুম ফসল বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে সাজেক, দোসর, নবছড়া, পেরা ছড়া, কচুছড়ি, ঘবঘোনা, অঞ্চল থেকেও ব্যাপক হারে বাজারে জুমের ফসল আসতে শুরু করেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, নদীতে ভরা যৌবন থাকায় টলার ও ছোট নৌকায় করে জুমের ফসল খুব সহজেই বাজার জাত করা যাচ্ছে।

 

কচুছড়ি এলাকার জুমিয়া মংশি চাকমা বলেন, জুমে এবার ভালো ধান হয়েছে এবং কমপক্ষে ৯ মাসের চালের জোগান জুম চাষ হতেই আসবে। অনেক জুমিয়ারই পুরো বছরের খাদ্যের জোগান জুম হতে আসবে।

 

একই এলাকার রানা চাকমা বলেন, জুমে ভালো ধান ও শাক-সবজি হয়েছে এবার। তবে করোনার কারণে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত বাকি শাক-সবজি কম দামে বিক্রয় করতে হচ্ছে।

 

উপজেলা কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, পাহাড়ে অনেক আগে থেকেই সনাতন পদ্ধতিতে জুমচাষ হয়। তবে অনেক চাষীই কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে এখন আধুনিক চাষাবাদ প্রক্রিয়া রপ্ত করেছে তাই আগের তুলনায় অনেক বেশি ফলন পাচ্ছে। তবে জুম চাষের লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণও কম নয় চাষাবাদ শুরুর আগে পাহাড়ের গাছপালা কেটে আগুন দিতে হয় এতে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি হয়, তাই উপজেলা কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তর থেকে অনেক চাষীকেই মিশ্রফল বাগানের প্রশিক্ষণ ও চারা এবং প্রয়োজনীয় সার কিটনাশক দিয়ে সহায়তা করছি যাহাতে জুমচাষ থেকে ফিরে আসেন। ধীরে ধীরে জুম চাষ সিমিত হয়ে আসছে।

 

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ের আবহাওয়া খুব বৈচিত্র্যময় সারাদিন রোদ, রাত হলেই বজ্রসহ ভারী বৃষ্টি। বাঘাইছড়িতে আমার চাকরিকাল এক বছর হল,শুরু থেকে এমনটাই দেখছি, বৈচিত্র্যগত ভাবেই পাহাড়ের মাটিরও ভিন্ন রুপ। এই মাটিতে আপনি যা রোপন করেন খুবই চমৎকার ফলন হবে। হাটের দিন বাজারে জুমের নানা ধরনের সবজি দেখতে খুবই চমৎকার লাগে। এসব ফল সমতলে খুব একটা হয়না। খোঁজ নিয়ে জানলাম এবার বাঘাইছড়িতে জুমের ব্যাপক ফলন হয়েছে। তবে উপজেলা প্রসাশনের পক্ষ থেকেও জুমচাষে নিরুৎসাহিত করে মিশ্রফল বাগানে চাষীদের উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে।

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে সেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর নির্ঘুম রাত কাটছে এলাকাবাসীর

কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : ১ মাসে ১৬ টি ছাগল চুরি
পর থেকে চোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটচ্ছে গ্রামের ছাগল মালিকরা। মইদুল ইসলামের ২ টি ছাগল চুরি হয়েছে। এর ধারাবাহিক এই চুরির ঘটনার পর থেকে গ্রামজুড়ে চোর আতঙ্ক
বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কোটচাঁদপুর উপজেলার পাঁচলিয়া গ্রাম থেকে গত ১মাসে ৯ বাড়ি থেকে ১৬ টি ছাগল চুরির ঘটনা ঘটেছে। পল্লী চিকিৎসক আব্দুল আলিমের ১টি, তহিদুল ইসলামের ১টি, আশরাফুল ইসলামের ৩টি, সাইদুল ইসলামের
১টি, জহির হোসেনের ১টি, দুরুদ মন্ডলের ১টি, তসলেম উদ্দিনের ২টি, ও আবু কালামের ২টি রয়েছে। চোরেরা ছাগল মেরে রেখে যায় আরও ১টি।
মইদুল ইসলাম বলেন, গত ১০ বছর ধরে আমি পঙ্গু হয়ে ঘরে পড়ে আছি। মাঠে অল্প একটু জমি আছে, তা থেকে খাবার ধানটা কোন রকম আসে। বাজার আর অন্যান ব্যয়ভার চলতো
আমার ছাগল বিক্রি করে। ছাগল ২টি পেয়েছিলাম আমি ছাগল পোষানি থেকে। তাও নিয়ে গেল চোরেরা। তিনি বলেন,
৩ছেলে মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে আমার সংসার। সংসারের আয় করি আমি একাই। এদিকে একের পর এক ছাগল চুরির ঘটনায় নির্ঘুম রাত কাটছে ওই গ্রামের ছাগল মালিক লালন খন্দকার ও মমিনুর রহমান। তারা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে
ছাগল পালন করে আসছি। এমন সমস্যা হয়নি কোনদিন
প্রায় দিন না ঘুমিয়ে রাত কাটছে এলাকাবাসীর। এ ব্যাপারে দোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল জলিল বিশ্বাস বলেন, চুরির ঘটনা ঘটেছে আমি জানি। বিষয়টি উপজেলা আইন শৃঙ্খলা সভায় তোলা হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত কোনো
ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কোটচাঁদপুরের লক্ষ্মীপুর পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক ( এসআই) মিজানুর রহমান বলেন, চায়ের দোকানে গল্প শুনেছি ১/২ টা ছাগল চুরি হয়েছে। এই ব্যাপারে আজ পর্যন্ত কেউ কোন অভিযোগ ও করেনি

ঝিনাইদহের৷কোটচাদপুর ১ মাসে ১৬ টি ছাগল চুরি